বেহাল সড়ক: বিব্রত মন্ত্রী

সড়কটি খানাখন্দে ভরা। রাস্তায় হেলে-দুলে চলে যানবাহন। যাত্রীদেরও মনে হয়, এই বুঝি উল্টে গেল গাড়িটি! বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট-কালুরঘাট সড়কের এ দুরবস্থা। কোনো উন্নতি নেই। তাই যাত্রীরা দোয়া-দরুদ পড়েই গাড়িতে ওঠেন।
এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরেই সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু, সেটি সংস্কার না হওয়ায় রাগে-দুঃখে প্রতিবাদ জানাতে শুক্রবার সড়কের চান্দগাঁও থানার মৌলভীপুকুর পাড় অংশে ধান রোপণ কর্মসূচির আয়োজন করেন তারা।
সড়কটিতে টানা দু`ঘণ্টা ধানের চারা লাগান এলাকার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা! এমন অভিনব প্রতিবাদ অবশ্য পৌঁছেছে যোগাযোগ ও রেলপথমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কানেও। এ রকম অভিনব প্রতিবাদসহ নানাভাবে, নানা মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সড়কের করুণ অবস্থার খবর মন্ত্রী প্রায় প্রতিদিনই দেখছেন, শুনছেন। গত একমাস ধরে সড়ক পরিদর্শনের কাজে যেখানেই মন্ত্রী যাচ্ছেন, সেখানেই বেহাল সড়ক দেখে হতবাক হচ্ছেন। জনসাধারণের বিভিন্ন প্রশ্নে বিব্রত হচ্ছেন।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াজুড়ে বেশিরভাগ রাস্তার অবস্থাই এখন খারাপ। যোগাযোগমন্ত্রী বিভিন্ন মহাসড়ক পরিদর্শন করে দেখেছেন, বৃষ্টি হলেই মহাসড়কে পানি জমছে। পরে আবার খানাখন্দ মেরামত হয় ইট আর মাটি দিয়ে। গত সপ্তাহে যোগাযোগমন্ত্রী কাঁচপুর ব্রিজ পরিদর্শনে গেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় মন্ত্রীর গাড়ি এদিক ওদিক দুলতে থাকে, প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিতে থাকে।

গাড়ির ভেতর থেকেই মন্ত্রী দেখেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি বাস খাদে পড়ে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা পেছন থেকে ঠেলেও সামনে নিতে পারছেন না। পরিদর্শনের একপর্যায়ে গাড়ি থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা সংলগ্ন মহাসড়কের পাশে গাড়ি থামিয়ে সড়কের অবস্থা দেখেন ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রী দেখতে পান, এবড়ো-খেবড়ো সড়ক। কাদা পানিতে একাকার। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত এ মহাসড়কেরও কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে জলাশয় হয়ে গেছে। একপাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী দেখেন, এ সড়কে কাদামাটির কারণে পা ফেলার মতো অবস্থাও নেই। গর্তের কারণে রাস্তায় পানি জমায় মানুষ লাফ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন।
এমন দুর্ভোগের চিত্র দেখার সময় এলাকার অসংখ্য মানুষ মন্ত্রীকে ঘিরে ধরেন। ক্ষোভে এলাকার এক বাসিন্দা মন্ত্রীকে জানান, ‘‘এ সড়কে গাড়িত উঠলে দোয়া-দরুদ পড়তে হয় আর পায়ে হেঁটে গেলে জুতা খুলে হাঁটতে হয়। কারণ, পুরো রাস্তা জুড়েই কাদামাটি। আর একটুখানি বৃষ্টি হলেই হাঁটুজল জমে যায় সড়কটিতে।’’
এলাকার বাসিন্দারা মন্ত্রীকে আরো জানান, বছরের পর বছর এ সড়কের নাজুক অবস্থা বিরাজ করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
মন্ত্রী জনসাধারণের কথা শোনার পর বললেন, ‘‘রাস্তাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে নয়। এটা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) আওতাভুক্ত। আমার এখানে করার কিছু নেই।’’
ডিসিসি’র আওতাভুক্ত এ সড়ক সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক জিল্লার রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘সমস্যাতো শুধুই ডিসিসি’র আওতাভুক্ত সড়কে নয়। তবে ডিসিসি’র আওতাভুক্ত যেসব সড়ক রয়েছে সেগুলোর দ্রুত সংস্কার করা হবে।’’
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তা যান চলাচলের অনুপযোগী। এর ফলে ওয়ারী, গুলিস্তান, নারিন্দা, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, নারিন্দা, স্বামীবাগ, গোলাপবাগ, দয়াগঞ্জসহ রাজধানীর একটি বড় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ তীব্র দুর্ভোগের শিকার। একই কারণে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছে এসব এলাকায় চলাচলকারী শত শত যানবাহন। শুধু এসব সড়ক নয়, সারা দেশের বিভিন্ন সড়কের অবস্থাই করুণ।
যোগাযোগ করা হলে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘আমার মেয়াদ অল্প। অল্প সময়ে যতোটুকু দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা দরকার, তা করতে চেষ্টা করছি। রাতারাতি সড়কের পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ, আমার হাতেতো ম্যাজিক নেই।’’
মন্ত্রী আরো বলেন, ‘‘সব সড়কের করুণ অবস্থার দায়ভার সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) নিতে পারে না। সওজের আওতাভুক্ত যেসব সড়ক আছে সেগুলো যাতে যান চলাচলের উপযোগী হয়, তার জন্য আমরা কাজ করছি।’’
সব সড়কের দায় নেবে না যোগাযোগ মন্ত্রণালয়
২৪ জুলাই যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের আওতায় প্রায় সারা দেশে ২১ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৩ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক ১৩ হাজার ৬৭৮ কিলোমিটার।

সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের আওতাধীন সড়ক ছাড়াও সারা দেশে অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগ/স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সড়ক নেটওয়ার্ক বিদ্যমান আছে। এ সড়কগুলো এলজিইডি, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ অন্যান্য সংস্থার অধীন।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানায়, অন্যান্য সংস্থার আওতাধীন সড়কগুলোর নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ ফ্লাইওভার, ওভারপাস নির্মাণসহ যাবতীয় কাজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান করে থাকে। অন্যান্য সংস্থার সড়কসমূহের নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা অন্য কোনো কাজ করার কোনো আইনগত এখতিয়ার সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের নেই। একই কারণে এর দায়-দায়িত্ব কোনোক্রমেই সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ওপর বর্তায় না বলেও জানিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।
খানাখন্দে সওজের রাস্তা
২১ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে সওজের। এসব সড়কের ৬০ শতাংশ রাস্তার অবস্থাই বেহাল।
সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে, দেশের ১৪টি সড়ক ও মহাসড়ক মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকির মধ্যে থাকা মহাসড়কগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ-শেরপুর-নেত্রকোনা, সিলেট-তামাবিল, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ, ঢাকা-বরিশাল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। এ ছাড়া ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে রাজশাহী বাইপাস সড়ক, যশোর-নওয়াপাড়া, খুলনা-বাগেরহাট-মংলা, জয়দেবপুর-ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ, গাজীপুর-পুবাইল-কালীগঞ্জ, কুমিল্লা (ময়নামতি)-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও বহদ্দারহাট টার্মিনাল সংযোগ সড়ক।
সম্প্রতি প্রতিবেদনটি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগে পৌঁছেছে। সড়ক বিভাগ থেকে গোয়েন্দা সংস্থার চিহ্নিত এসব সড়ক ও মহাসড়ক ঈদের আগেই সংস্কার ও মেরামতের জন্য সওজকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে গঠিত আটটি মনিটরিং কমিটি নিয়মিত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক পরিদর্শন করে সওজকে নির্দেশনা দিচ্ছে। তবে সওজ সড়ক সংস্কারে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখাচ্ছে।
‘আমি হলেও ধর্মঘট করতাম’
টানা এক মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক পরিদর্শন করছেন যোগাযোগমন্ত্রী। সড়কের বেহাল অবস্থা দেখে মন্ত্রীও হতাশ-হতবাক! এরই মধ্যে সওজের বেহাল অবস্থার কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সওজের অনেক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীকে কর্তব্য কাজে অবহেলার জন্য কারণ দর্শানো নোটিশ এবং কাউকে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন তিনি।
যোগাযোগ ও রেলপথমন্ত্রী যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই এলাকার জনগণ সড়কের বেহাল পরিস্থিতি তুলে ধরছেন। তোপের মুখে পড়ছেন মন্ত্রীও। শুক্রবার বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই চাঁদপুর সড়ক পরিদর্শনকালে মন্ত্রী বলেন, “চাঁদপুরের বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই সড়কের এতোটাই করুণ যে, জনগণ কেন আমি হলেও ধর্মঘট করতাম।”
মন্ত্রীর নির্দেশও অমান্য
গত সোমবার যোগাযোগ ও রেলপথমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঈদ পর্যন্ত সড়কের মেরামতের কাজে মোবাইল ইউনিট কাজ করবে। ট্রাকে এ ইউনিটের কাছে ইট বালিসহ সড়কের নির্মাণ সামগ্রী থাকবে। যেসব সড়কে গর্ত দেখা যাবে সেখানে এ ইউনিট তাৎক্ষণিক মেরামত করবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এখনও অধিকাংশ রাস্তা খানাখন্দে ভরা। রাস্তাজুড়ে কাদার স্তূপ। বিশাল বিশাল গর্ত, কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে জলাশয় হয়ে গেছে। এসব রাস্তা দিয়ে যারা চলাচল করেন, তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই।
রাস্তায় মোবাইল ইউনিটের কার্যক্রমও চোখে পড়ার মতো নয়। ফলে মন্ত্রীর নির্দেশ এখন পর্যন্ত উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Advertisements

আপনার মন্তব্য এখানে লিখুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: